Wednesday, 6 July 2022

তৈমুর খানের গুচ্ছ কবিতা




তৈমুর খানের গুচ্ছ কবিতা --

কবিতারা উঠে দাঁড়াতে চায়
 

তোমার অসুখের বিছানার পাশে
আমার কবিতারা বসে আছে
কোথাও যায়নি ওরা
জানালার চাঁদে হাত বাড়ায়নি ওরা
স্নেহান্ধ পিচ্ছিল কান্না চেপে
সারারাত জেগে জেগে আছে।

কী বলল ডাক্তার?

হয়তো সেরে যাবে
তিনমাস বিশ্রামে তারপর একটু একটু করে

কে দেখবে সংসার? আমরা সবাই হাওয়া খাব?
ছেলেমেয়ে আর শীতের কুয়াশার হাত ধরে
রোদের অপেক্ষা করে করে আমরা কি বিপ্লবী হব?

মৃত্যুকে পুষে পুষে রোজ বড় করি
মৃত্যু কি কোনও দিন আলো হতে পারে?
ডাক্তারের কাছে কোনও সমাধান নেই
শুধু অ্যানাস্থেসিয়া আর ডেটলের গন্ধ ঘরময়
সেলাইন চুপচাপ শরীরে ঢোকে
যন্ত্রণারা উপশম চায় আমার শব্দের কাছে 

কবিতারা উঠে দাঁড়াতে চায়
সুসংবাদ এসে যদি দরজা খুলে ডাকে!


জানোয়ার
 

আমরা স্বর্গের দিকে যেতে যেতে দুইপাশে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিলাম
আমরা সবাই দেবতা—চারিপাশে আমাদের শরীরের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছিল
চারিপাশে সবাই আমাদের দেখছিল আর ফুল ছুঁড়ে অভিনন্দন জানাচ্ছিল

আমাদের কোনও ভ্রুক্ষেপ ছিল না সেদিকে 
হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছিলাম স্বর্গযানে
দুইপাশে মরচেধরা প্রাণী—ক্ষুধার্ত—ভঙ্গুর—তৃষ্ণার্ত—হাহাকারপ্রিয়... 
দুইপাশে কসাইয়ের দোকান—
নিরন্তর ছুরি শান দেওয়ার শব্দ
নিরন্তর দুর্বোধ্য ভাষার চিৎকার... 

আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা
স্বর্গে যেতে যেতে দেখছি এসব;
আমাদের গাড়ির চালক জানাল:
এরা সবাই বিভিন্ন জাতের প্রাণী—
পৃথিবীতে এদের জানোয়ার নামে ডাকা হয়!

            
দুপুরের ডাকঘর 
    

দুপুর এসেছে,একটু পর চলে যাবে
তাকে কিছুই বলার নেই
অনেক মৃত সকাল, শিশির ভেজা ভোর
স্মৃতির আলোয় পড়ে আছে

পাখিদের কলতান উড়ছে কোথাও
কোথাও বিগতা কুমারী শিস দেয় আজও
শরতের শালুক ফোটা দিঘি আর নেই
দিঘির বকেরা সব মৃত! মাছগুলি চলে গেছে অন্যকোনও সমুদ্রের দিকে....

এখন হৃদয় পেতে ছায়া খোঁজা দিন
বিশ্রামে নীরব হয়ে থাকা
মাটি ফাটা তাপে বয়ে যায় দীর্ঘশ্বাস
শীত আর কুয়াশায় লেখা জীবনের শেষ চিঠি
নিয়ে এসেছে দুপুরের ম্লান ডাকঘর
        


স্পর্শ
    

এই হাত, আমারই হাত, আমিই স্পর্শ করি
সমস্ত শরীর জুড়ে এখনও সেই স্পর্শের শিহরণ পাই
 যে আলো নিভে গেছে বহুদিন
 এখনও তার উজ্জ্বলতা আছে
 এখনও অক্ষরগুলি পড়ে নিতে পারি

হৃদয় পাথর হয়ে গেছে, যে শোকে পাথর হয়
সব বেদনার অশ্রুগুলি
পথও হারায় পথে
 ঠিকানাও বদল হয় অন্য কোনও ঠিকানায়

একটা শূন্যের মতো পৃথিবী গড়াতে গড়াতে
দিনরাত্রি প্রসব করে শুধু
ফেল করা ছাত্রের মতো আমরা শুধু অংকে শূন্য পাই
ঘর বানাতে বানাতে প্রতিদিন ঘর ভেঙে ফেলি 
প্রদীপ জ্বালাতে জ্বালাতে প্রতিদিন ডাকি অন্ধকার

স্মৃতির কাঁচ মুছতে মুছতে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়
 শুধু হাতখানি স্পর্শ ধরে রাখে
 যে স্পর্শ তার একান্ত ঈশ্বরীর...
            

সোনার মঙ্গলকাব্য


রাতদিন সোনার হরিণ শিকার করি
আর হরিণের মাংস আনি ঘরে
ফুল্লরা রান্না করে দেয়
আমি ও আমার সন্তান মিলে খাই

সোনার সংসারে আমরাও সোনার মানুষ
রোদ্দুরে চিকচিক করে শরীর আমাদের 
অরণ্য প্রত্যহ হরিণ প্রসব করে

সোনার তীর-ধনুক হাতে যখন দাঁড়াই
আমাদের গল্পগুলি পাখা মেলে ওড়ে
গল্পগুলি খুঁজে ফেরে মুকুন্দরামের ঘর

কত যুগ পার হচ্ছে, সোনার হরিণ হচ্ছে মায়া
আমরাও বদলে যাচ্ছি লোহায় পেতলে
ফুল্লরাও পাল্টে হচ্ছে ফেলু-ফেলানিতে

তীর-ধনুকগুলি এখন বন্দুক-পিস্তল
অরণ্য নগর-রাষ্ট্র সমূহ শিকারভূমি এই সভ্যতার
সন্তান-সন্ততি মিলে আমরা সব মরীচিকা খাই 



***নব্বই দশকের কবি ও গদ্যকার। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'কোথায় পা রাখি' (১৯৯৪) ।কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ :বৃত্তের ভেতরে জল, জ্যোৎস্নায় সারারাত খেলে হিরণ্য মাছেরা, উন্মাদ বিকেলের জংশন, স্তব্ধতার ভেতর এক নিরুত্তর হাসি, নির্ঘুমের হ্রস্ব ধ্বনি, আকাঙ্ক্ষার ঘরের জানালা, সভ্যতা কাঁপে এক বিস্ময়ের জ্বরে ইত্যাদি । পুরস্কার পেয়েছেন :কবিরুল ইসলাম স্মৃতি পুরস্কার, দৌড় সাহিত্য পুরস্কার, নতুনগতি সাহিত্য পুরস্কার ইত্যাদি ।ঠিকানা :
তৈমুর খান, রামরামপুর (শান্তিপাড়া), ডাকঘর :রামপুরহাট, জেলা বীরভূম, পিন কোড ৭৩১২২৪, পশ্চিমবঙ্গ ।ফোন নম্বর ৯৩৩২৯৯১২৫০

সমুদ্র দেখা--দেবকুমার মুখোপাধ্যায়

সমুদ্র দেখা--
দেবকুমার মুখোপাধ্যায়

সমুদ্র দেখিনি আমি অনেক বছর,
শুনে পড়ে কল্পনায় বহুবার দেখা হয়ে গেছে।
অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এইবার মুখোমুখি,
বিকেলের পড়ন্ত আলোয়
দূর সমুদ্রের নীল ভালো লাগে,
যা কিছু দূরের তাই নীল
যেমন আকাশ।

মনে হল সমুদ্র দূরের বড়,
দূর থেকে সসম্ভ্রমে দেখা।
একটানা ঢেঊয়ের শব্দ
যেন কেউ একই সুর একই যন্ত্রে বাজিয়ে চলেছে।
এর চেয়ে নদী তো কাছের
তার সুরে তাল,ছন্দ,লয় মন টানে,
নদী যেন সেতুবন্ধ এপারে ওপারে
সমুদ্র তফাতে রাখে,
দু দেশের মাঝখানে যেন এক নিমানব ভূমি।

সূর্য ওঠার আগে পরে
ভোরের সমুদ্র দেখে ভালো লাগে_
নৌকো ভেড়ে তটে,
দশ বিশ জনে মিলে জাল তোলা,
ছোট বড় বিচিত্র মাছের বাটোয়ারা,
ঢেউ ভেঙে ছেলেদের চান,
এইসব যেন কোন নিষেধ ডিঙোনো
কার্ফুবন্দি শহরে যেমন দু হাত ঊর্ধ্বে তুলে রাস্তা পার হওয়া।

মানুষ কাছে না গেলে
প্রকৃতিও কানা হয়,
শক্ত তটের বুকে সমুদ্রের ঢেউ
যেন মানবীর বুকের গড়নে ধরা আছে।

**"পরিচিতি
জন্ম ১৯৫০। স্নাতক। কবিতা,ছড়া, ছোট গল্প, অণু গল্প, নিবন্ধ লিখে থাকি।, বড়দের জন্য, ছোটদের জন্যও। কিছু অনুবাদও করেছি কবিতা ও গল্পের, বাংলা থেকে ইংরেজিতে। প্রকাশিত বই_ আসলে আলোর জন্যে, এখানে তরঙ্গ এখানে জীবন,জলের উপমা, অপ্রিয় শব্দমালা আর যৌথভাবে যারা কবিতা পড়েন না,ছড়ার মজা খাস্তা গজা, চার মাথার মোড়।

রতন বসাকের তিনটি কবিতা

রতন বসাকের তিনটি কবিতা --

(১)
সহজ নয়


প্রেমে পড়া কঠিন নয় তো
জ্ঞানী মানুষ বলে,
তারই ছবি আঁকতে থেকে
ভালোবাসার পথটি দেখে
উদাস মনে চলে।

অনেক আশা অনেক স্বপ্ন
ভেবে জীবন গড়ে,
সুখের ছোঁয়া পাবে শেষে 
কল্পানার ঐ রাজ্যে ভেসে
প্রেম পাহাড়ে চড়ে।

সময়গুলো চলতে থাকে
ঘড়ি কাঁটার সাথে,
দূরেই থাকে ভালোবাসা 
দেয় না কিছু মনে আশা
ভাবনা বাড়ে মাথে।

ভালোবাসা যেমন সহজ
এক পলকে দেখে,
তেমন শক্ত পেতে গেলে
দেখা গেছে কষ্টই মেলে
তাতে আশা রেখে।

(২)
ভীষণ সমস্যা


বানের জলে ভেসে গেলো
চাষের বলদ দূরেতে,
তার কারণেই মনের বীণা
বাজে করুণ সুরেতে।

দৌড়ে এলাম মাঠের পরে
জল ঢুকেছে বাড়িতে,
প্রাণে বেঁচে থাকবো বলে
বাধ্য হলাম ছাড়িতে।

জমির ফসল ডুবে গেছে
পচন তাতে ধরেছে,
জলস্রোতে গ্রাম শহরের
মানুষ পশু মরেছে।

নেতারা সব ত্রাণটা দিতে
সেল্ফি আগে নিয়েছে,
সংবাদপত্রে নাম কামাতে 
তবেই হাতে দিয়েছে!

খাবার কিছু নেই তো ঘরে
কেমন করে খাবোরে,
খিদের জ্বালা মেটাতে ভাই
কোথা আমি যাবোরে?

(৩)
নিজেকে দিচ্ছি ফাঁকি

মানব দেহে জন্ম নিলাম
এই জগতের পরে,
ভোগবিলাসে সময় বয়ে
ঘড়ির কাঁটা সরে।

বিবেকের ঘর বন্ধ রেখে
স্বার্থ দেখেই চলি,
কাজে নহে মুখেই খালি 
ভালো কথা বলি!

পরের দেখে হিংসা করে
জ্বলে পুড়ে মরি,
সুযোগ বুঝে সবার আগে
নিজের ঘরে ভরি।

কারো ভালো চাই না কভু
মনের থেকে আমি,
গরিব দুখীর কষ্ট দেখেও
কোথায় বলো থামি?

আমি কেমন জানার জন্য
হেথা-হোথা ঘুরি,
মুখোশ পরে সাজছি সাধু 
করে যাচ্ছি চুরি!


***পরিচিতি : -
জন্ম :- ২৬ .০২.১৯৬৭
স্থান :- কলকাতা
শিক্ষা :- স্নাতক (B.A.)
প্রাক্তন সৈনিক, ভারতীয় বিমান বাহিনী। 
জুন, ২০১৮ থেকে আমি ছড়া, কবিতা ও প্রবন্ধ লেখা শুরু করি । ফেসবুকে বিভিন্ন সাহিত্য গ্রুপে নিয়মিত প্রতিদিন লেখালেখি করি । এ পর্যন্ত ৫০০০ টির বেশি বিভিন্ন সাহিত্য গ্রুপ থেকে সম্মাননা প্রাপ্ত কবিতা লিখেছি । ২৫ টির বেশি যৌথ কাব্য সংকলন, ৫০ টির বেশি ই - বুক ও ১ টি একক পরমাণু কবিতার বই আমার বের হয়েছে ।

দীপান্বিতার সলতে"--কার্ত্তিক মণ্ডল

দীপান্বিতার সলতে"
                      কার্ত্তিক মণ্ডল

তোর জন্য ভারি মন কাঁদে---!
ছোট্টবেলায় উঠোন জুড়ে তোর সেই খিলখিলানো হাসি আর হাত পা নেড়ে নেড়ে কত যে অঙ্গভঙ্গি করতিস
আজও তা ভুলতে পারি না,
পদ্মের পাপড়ির মত-----!
একটি একটি করে খুলত ।
শাখা পল্লবে যখন রূপ এলো
পায়ের নূপুরে নিক্কণের সুর,
সারা ঘর ভরা মেদুরতা
পলাশ কৃষ্ণচূড়ায় ভরা বসন্ত ,
হাঁসের পাখনায় সীমন্ত আঁকা রামধনু
গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্তের কোলে
তুই নদী হয়ে গেলি,
কূল ভাঙা নদী
রেদ ঠেলে ঠেলে যেই সাগরে মিশে গেলি
অফুরন্ত জল
তৃষ্ণা মিটল কিনা জানি না !
অথচ----
আমাদের মাটির ঘরের আলো নিভে গেল,
আলো নিভে গেল তোর জন্ম শিশুর
সে বড়ো হবে মাতৃ হারার ব্যথা নিয়ে
সারা জীবন হাতড়াতে হাতড়াতে
এই বিশাল বুভুক্ষু পৃথিবীর বুকে
মাতৃ হারা অনাথ অবহেলিত
দীপান্বিতার সলতে হয়ে----------!


***কার্ত্তিক মণ্ডল
গ্রাম-পশ্চিমবাড়
পোস্ট-ধনেশ্বরপুর
থানা- পিংলা
জেলা-পশ্চিম মেদিনীপুর
পিন-721166
পিতা-বিজয় মণ্ডল
মাতা-মুক্তাবালা মণ্ডল
জন্ম-25/07/71
শিক্ষা-বি এস সি বি এড
পেশা-শিক্ষকতা
লেখালেখি-পঞ্চম শ্রেণী থেকে
দেশ বিদেশের বিভন্ন পত্রিকায়
প্রকাশিত বই-চাঁদের কণা
পুরস্কার- ই-সৃষ্টি সারথি ২২

ঘাসের দেশে --মাথুর দাস

ঘাসের দেশে

মাথুর দাস

ঘাসের দেশে বাস করে না সিংহ হাতি বাঘ,

একটিও নেই ছায়াতরু, তপোবনের আশ্রম ;

নেই জলা বা জঙ্গলও, মরুর মরীচিকা-ভ্রম,

শঙ্কাবিহীন  চরে  বেড়ায়  ভেড়া হরিণ ছাগ ।



ঘাসের দেশের শ্যামলিমা নয়ন-অভিরাম,

দু'চোখ জুড়ায় দৃশ্য দেখে হরিৎ ক্ষেত্রে ঢেউ ;

শষ্পরাজির বাহার বুঝি এড়াতে পারে কেউ !

লহর তুলে বয় যে বাতাস নিত্য অবিরাম ।



ঘাসের দেশে  বৃক্ষ নেই,  ঋক্ষকুলও উধাও,

অহিংসতায় বিরাজ করে  চির নিঃঝুম শান্তি ;

ঘাসের দেশ ঘাসেরই দেশ নধর শ্যামলকান্তি ।

এমনতর ঘাসের দেশ পাবেই না তো কোথাও ।



***পরিচিতি :--

-----------

মাথুর দাস । কবি ও ছড়াকার । বসবাস পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরে । কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা দুর্গাপুর স্টীল প্ল্যান্ট থেকে অবসরপ্রাপ্ত । মূলত কবিতা ও ছড়া লেখেন । নিয়মিত দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ছাড়াও বিদেশে অর্থাৎ বাংলাদেশ, আমেরিকা, ফ্রান্স, কানাডা, সৌদি আরব ইত্যাদি জায়গার জনপ্রিয় পত্র-পত্রিকাতেও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয় ।

শংকর ব্রহ্মর কবিতা

কবিতাগুচ্ছ
শংকর ব্রহ্ম

-------------------------------------
শংকর ব্রহ্মর কবিতা      
-------------------------------------

১).

স্বপ্নরেণু
-----------------

মুঠো ভর্তি ফুলরেণু, 
      রংবেরংয়ের আশা একদিন ভাষা পাবে ভেবে,
তুলে রাখি গোপনে সিন্দুকে, পরম আদরে
                   নিন্দুকে বলবে কত কথা, তা ও জানি
তবু কাঁথা কানি জড়িয়ে,এসো বসি এখন,
      এইবার শীতে, আর কোথাও যাব না বেড়াতে।

অন্তরে তুমি গান ধরবে গুনগুন স্বরে,
          মৌমাছিরা ছুটে আসবে ঘরে আদর করবে,
সবরেণু ঝরে পড়বে তোমার উপরে এরপর ফিরে যাবে ওরা,
তারপর কি যে হবে,তা কি কোনদিনও ভেবেছো অন্তরে?

শোন তবে,মুঠো ভর্তি রংবেরয়ের স্বপ্ন আশা
            একদিন ভাষা পেয়ে, ফুলের মতো ফুটবে,
তারপর দ্রুত মৌমাছিরা ছুটবে আনন্দে দিশেহারা হয়ে,
            তাতে আবার তুমি কুঁকড়ে যেয়ো না ভয়ে। 
সে কথা কি তুমি, জানতে চাও তবে?
                         কোথায়, কি ঘটবে জীবনে কবে?

---------------------------------------------------------------
২).

আপেক্ষিক
------------------------------

                                       জয় পরাজয় সব কিছুই আসলে ছিল আপেক্ষিক
এমন কি আমার ব্যক্তিগত প্রণয়ও।

                                           কে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী? 
এই ভেবে প্রতিনিয়ত দুঃখ পেয়েছি,
                  গাছের ছায়া এড়িয়ে গেছি অবহেলায়
প্রখর রৌদ্রে পুড়ে
                   খাঁটি সোনা করতে চেয়েছি নিজেকে।

অযথা ভালবাসার টানে 
                                 শিরা-উপশিরা ছিঁড়ে গেলেও
তার জন্য কষ্ট পাইনি ,
                             ভেবেছি এটাই ভালবাসার জয়
অথচ ভালবাসতে চেয়ে
                                    পরাজিত হয়েছি বারবার।

আসলে সব কিছুই ছিল আপেক্ষিক
                      এমন কি আমার ব্যক্তিগত প্রণয়ও।

---------------------------------------------------------------
৩).

অপেক্ষায়
---------------------

পোষ মানাতে না পারলেই
বুকের আগল ভেঙে ভালবাসা ছুটে যায় দিক বিদিকে
আপোষহীন দুঃখের কাছে 
কবিরাই সর্বদা ছুটে আসে সন্ধ্যায় আপোষ করতে।

আর খরস্রোতা নদীর বুকে অন্ধকার ঝুঁকে পড়ে
ঠোঁট রাখে নির্দিধায়,
অহংকারে বুকে তার ঢেউ ওঠে।

মনে পড়ে যৌবনের সন্ধিক্ষণে কাউকে বলেছিলাম ভালবাসি
অথচ হৃদয় খুলে তাকে দেখাতে পারিনি ভালবাসা
তৎক্ষণাৎ লোডশেডিংয়ে সারা পাড়া জুড়ে
নেমে এসেছিল অন্ধকার।
সে রমণী অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল,
ফিরে আসেনি আর 
আমি অপেক্ষায় ছিলাম,আজও অপেক্ষায় আছি তার।

---------------------------------------------------------------
৪)

কবির_কাজ
---------------------

সুজন ছাড়া টেকে না সংসার
                      কারও জন্য ভাবে না কেউ আর,
অন্ধকারে বন্ধ থাকে দ্বার
                     বিপদকালীন কে আর বল কার?

সবাই বাঁচে স্বার্থ নিয়ে তার 
                         এটাই এখন সংকট সভ্যতার
কেউ যে নেই পাশে দাঁড়াবার
                         তাই বিপদ বড় মানবিকতার।

দুর্জনের হাতে যে সমাজ
                       সেই সমাজে কবির বড় কাজ
ছিঁড়ে ফেলে মুখোশপরা সাজ
                       তুলে ধরা মানবিক আওয়াজ।

---------------------------------------------------------------
৫).

প্রলাপ                     
--------------

আমরা বসতাম যে বাগানে, সেখানে উঠেছে কত বাড়ি ,
তবু আমি এমন আনাড়ি
                আতি-পাতি সেখানে তোমাকে খুঁজে ফিরি।
মাঝে মাঝে যাই,দেখে আসি,
তোমাকে যে ভালবাসি বলিনি কখনও
           তবু দিন দিন আরও মায়াটান বেড়ে যায় যেন।

অনাদর ও উপেক্ষার ভাষা আছে
                                আমি তা শিখতে পারিনি বলে 
আজও পথে হঠাৎ দেখা হলে পরে
                          একগাল হাসি নিয়ে সামনে দাঁড়াই।
অনায়াসে উপেক্ষার ভান করে তুমি যাও চলে
        আমি যে কেন তা পারি না,তুমি দুঃখ পাবে বলে?

---------------------------------------------------------------
৬).

খোঁজা
----------------------------
                     
                         বাহিরে আর রেখো না আমায়
অন্তরে লুকিয়ে রাখো শুধু,
                              যেন কেউ দেখতে না পায়।
ওই দেখ খাঁচা ছেড়ে পাখি উড়ে যায়
         আমিও তো উড়ে যাব হায় দূরে কোথায়,
খুঁজে আর পাবে না তো তুমি।
                        বাইরে আর ডেকো না আমায়
রাখ তব জুড়ে মনোভূমি,
                             জানি না যে হারাব কোথায়
খুঁজে আর পাবে না যে তুমি।

---------------------------------------------------------------
৭).

তোমাকে খোঁজা
-------------------------

তোমাকে পাইনি আগে
                             তাই রাগে ভেঙেছি হৃদয় ,
সে ভাঙা হৃদয় তুমি জুড়ে দিতে এসে
                           কেন বল ফেলে ভালবেসে
ছড়ালে ফুলের বীজ কিছু  
                              হয় তো তা নয় শুধু মিছু।

                সে বাগান আজ ভরে গেছে ফুলে
আজ তুমি কাছে নেই ,
                            আমি তাই হারিয়েছি খেই
বাগানে খুঁজছি ভুলে, 
                           ফুল ছিঁড়ে শুধু তোমাকেই।

---------------------------------------------------------------
৮).
                                 
ধাক্কা মারুন
-------------------

এই যে হৃদয় 
এইখানে আজ বাস করে এক দুঃখি মানুষ ,
নেই তার মান নেই তার হুশ
আছে কেবল থাকার মধ্যে নিঃস্ব হৃদয় ,
সেখানে রাখছে লিখে মনের সকল গোপন ভয়।

অন্য সবার দুঃখ ব্যথায় হৃদয় যে তার জর্জরিত 
তবু সে নয় তো ভীত
এই সমাজের নিঃস্ব যারা তাদের মতো  
ভবিষ্যতে কি হবে তার কিংবা তাদের ,
এসব কথা ভাবতে বসে হৃদয় কাঁদে।

তবু চোখে আসে না জল জ্বলে মনে তীব্র আগুন
সবাইকে সে ডেকে বলে এবার সবাই একটু জাগুন ,
একটু  না হয় রেগে আগুন হয়ে
এই সমাজের অবিচার আর 
অত্যাচারের বন্ধ দ্বারে সজোরে এক ধাক্কা মারুন।


---------------------------------------------------------------
৯).

ভোটতন্ত্র
-------------------

                       জনগণতন্ত্র মূল তার মন্ত্র 
নেই আর দরকার
তোমাদের প্রয়োজন নিজেদের ভাববার 
        তোমাদের দরকার আমরাই ভাবব
তোমাদের দাবী নিয়ে প্রয়োজনে
                       আমরাই রাজপথে নাবব 

এ ছাড়া আমাদের 
                           নেই কোন কাজ আর
তোমাদের নেই আর দরকার
              নিজেদের প্রয়োজন ভাববার 
যা ভাবার আমরাই ভাবব 
প্রয়োজনে দাবী নিয়ে রাজপথে নাবব 

         সোজা কথা সোজা ভাবে বুঝে নাও
আর কিছু না ভেবেই আমাদের ভোট দাও 

---------------------------------------------------------------
১০).

ভাবনা
-------------

ভাবি মনে মনে
       কবিতা লিখব না আর কখনও জীবনে।

কবিতার ভাবগুলি আজকাল 
           আমাকেই দেখে যেন অসহায় চোখে,
হাই ভোল্ট বিদ্যুতের মত আতঙ্ক ছড়ায় মনে,
আর শব্দগুলি হায় নির্মম ভাবে 
                          হাড়-মাস ছিঁড়ে খেতে চায়।

আমাদের এইসব ছদ্মবেশী জীবন যাপনে, 
                              আজ এই অন্ধকার দিনে
কবিতার বল আর বাঁচবার জায়গা কোথায়?

---------------------------------------------------------------
১১).

একাকীত্ব
--------------------------

এ'ভাবেই ফিরে যেতে হয়,
                        কত ইচ্ছে ধরে রেখে মনে
এ'ভাবেই ফিরে যেতে হয়
                         কত স্বপ্ন বুকে পুষে রেখে
এ’ভাবেই ফিরে যায় 
                                        গন্ধ রেখে ফুল
এ'ভাবেই ফিরে যায় 
                                 জ্যোৎস্না রেখে চাঁদ
এ'ভাবেই ফিরে যায় প্রেম 
                                        ছড়িয়ে বিষাদ
সকলেই আসে ফিরে যায়
                    শুধু পড়ে রয় একাকী হৃদয়
এভাবে অতৃপ্তি নিয়ে বুঝি 
                     সকলকেই ফিরে যেতে হয়?


---------------------------------------------------------------
১২).

ক্ষীণ প্রতিচ্ছবি
------------------------

সারাদিন বৃষ্টি পাত
              সারা রাত
তোমার মুখের রেখা ভিজে যায় জলে
তবুও অস্পষ্ট কিছু জেগে থাকে 
                                     উদাসীন হলে। 

ডালিম দানার মতো দাঁতের গোপন ধার
                   কামড়ে ধরে বুকের গভীরে। 

সারা রাত বৃষ্টিপাত
                সারা দিন
তোমার মুখের ক্ষীণ প্রতিচ্ছবি
                জেগে থাকে আমার ভিতরে। 

---------------------------------------------------------------

সুদীপ্ত বিশ্বাসের গুচ্ছ কবিতা

সুদীপ্ত বিশ্বাসের গুচ্ছ কবিতা --

বাউল 

একলা বেশ তো আছি,একলা থাকাই ভালো
দুপুরে ডিস্কো নাচি, রাতে পাই চাঁদের আলো।
কোনো এক নিঝুম দুপুর, কিংবা গভীর রাতে
মনে আর পড়েই না তো,টান দিই গঞ্জিকাতে।
পরোয়া করব কেন? সমাজটা দিচ্ছে বা কী?
ছোট্ট জীবন আমার, তাইতো নাচতে থাকি।
পলকা এই জীবনে, কী হবে দুঃখ এনে?
চল্ না উড়াই ঘুড়ি, সুতোতে মাঞ্জা টেনে।
লাফিয়ে পাহাড় চড়ে, সাঁতরে নদীর বুকে
কবিতা দু'এক কলি আসলে রাখছি টুকে।
এভাবে কাটছে তো দিন,তোমাকে আর কী খুঁজি?
জানিনা কোথায় তুমি, আমাকে ভাবছো বুঝি?
ভাবলে কী হবে আর, নদীতে জল গড়ালে
চাঁদটা বন্ধু আমার, গভীর এই রাত্রিকালে 
গাছেরা আগলে রাখে, পাখিরা গাইতে থাকে
ঘরে আর যায় কী ফেরা? ওই যে বাউল ডাকে !

রাত

জেগে বসে আছি রাতের গভীরে একা।গোটা পৃথিবীটা ঘুমে
আকাশের বুকে অনেক তারার মেলা,কিছু লোক চ্যাটরুমে
সম্পর্ক তৈরিতে এখনও ভীষণ ব্যস্ত।ওড়ে রাতচরা পাখি
শাল-পিয়ালের আধো ঘুমে ভেজা ডালে।কবিতায় লিখে রাখি
ছলাৎ-ছলাৎ শব্দে নদীটা এগোয়, সাগরের অভিসারে
পাহাড় চূড়াটা একাএকা জেগে থাকে এ রাতের অন্ধকারে
লাজুক চাঁদটা গাঁয়ের বধূর মতো ঘোমটায় মুখ ঢাকে
দু'একটা পাতা খসে যায় চুপিসারে, কেই বা হিসেব রাখে?
বনের গভীরে নিশাচর ছুটে যায়, রাতের শিশির ঝরে
খুব মমতায় পৃথিবীর সারা গায়ে। মনে পড়ে মনে পড়ে
হারানো সেসব বাঁধাবাঁধি করে বাঁচা, সুরেসুরে বাঁধা তার
গভীর গভীর অজানা অলীক দেশে প্রেম ভরা অভিসার...

কাঁটাতার

আমরা পাখিরা উড়ে যাই কতদূরে
কত দেশ-গ্রাম ইয়ত্তা নেই তার
মানুষেরা শুধু ঝগড়া-বিবাদ করে
মানুষের শুধু দেশভাগ কাঁটাতার।

আমরা নদীরা বয়ে যাই কত দূরে
পাহাড়ের থেকে দূর সাগরের পার
মানুষেরা শুধু দ্বন্দ্ব-বিবাদ করে
মানুষের শুধু দেশভাগ কাঁটাতার।

আমরা আলোরা সূর্যের থেকে এসে
ভেদাভেদ ভুলে ঘোচাই অন্ধকার
মানুষেরা শুধু দ্বন্দ্ব-বিবাদ করে
মানুষের শুধু দেশভাগ কাঁটাতার।

আমরা মেঘেরা হাওয়ার ডানায় ভেসে
কত পথ চলি হিসেব থাকে না তার
মানুষেরা শুধু দ্বন্দ্ব-বিবাদ করে
মানুষের শুধু দেশভাগ কাঁটাতার।

মানুষেরা কেন কাঁটাতার ভালোবাসে?
হিংসা বা দ্বেষে কেন যে বিবাদমান!
কেন যে শেখেনি ভালোবেসে বেঁচে থাকা,
নদী বা বাতাস,মেঘ-পাখিদের গান।

বিপ্রলব্ধ
- সুদীপ্ত বিশ্বাস
ত্রহ্যস্পর্শে তিথিক্ষয়ে চাঁদের দেখা নেই
মঞ্জুষাতে লক্ষ্মীকে নয়, চাইছি তোমাকেই।
তামরসের মতোই তুমি, মুগ্ধ হয়ে থাকি
ধৈবতহীন আরোহণে তিলক কামোদ রাখি।
অনিকেত শব্দচাষী বন-পাহাড়ে ঘুরি
স্মিত হাসির ময়ূখছটায় মন করেছ চুরি।
ভৈরবের ওই বিরহী সুর পাখির ডাকে ঝরে
বিপ্রলব্ধ, বিহানবেলায় বড্ড মনে পড়ে।


শব্দার্থ ঃ-
তিথিক্ষয় ~ একদিনে দুই তিথির ক্ষয় হয়ে তৃতীয় তিথির সংযোগ; ত্রাহ্যস্পর্শ; অমাবস্যা।
মঞ্জুষা ~ লক্ষ্ণীর ঝাঁপি।
তামরস ~ পদ্ম।
তিলক কামোদ হল একটা রাগ।এই রাগে অবরোহণে সাতটি সুর থাকলেও আরোহণে ধা বা ধৈবত সুরটি থাকে না।
অনিকেত ~ গৃহহীন পথিক।
শব্দচাষী ~ কবি।
ময়ূখ ~ রশ্মি।
ভৈরব হল প্রভাতকালীন একটা রাগ।ভোর বেলা গাওয়া হয় এই রাগ।
বিপ্রলব্ধ অর্থ বঞ্চিত বা প্রতারিত।
বিহানবেলা মানে সকালবেলা।



Sudipta Biswas,Deputy Magistrate,(WBCS Exe.),
Nokari Uttar Para, PS-Ranaghat,Dist- Nadia,Pin- 741202
Mob-9836020902

দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়ের গুচ্ছ কবিতা --

দর্পণা গঙ্গোপাধ্যায়ের গুচ্ছ কবিতা -- চেনা চেনা চেনা মুখ আসে কালো মেঘের গায় অচেনা মানুষের ভিড়ে হারিয়ে খুঁজি তায় স্বার্থপরতা ব...